ঢাকা কাস্টম হাউসে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খানের বিরুদ্ধে। বিসিএস ৪০তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে আইন ও যাচাই-বাছাইয়ের তোয়াক্কা না করেই তিনি পণ্য চালান খালাস করে আসছিলেন। সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির এই ঘটনা এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ওপেন সিক্রেট।
সর্বশেষ একটি মিথ্যা ঘোষণার পণ্য চালান মাত্র ৩৫ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা তদন্ত করে দেখে ঢাকা কাস্টম হাউস। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, ওই চালানে সরকারের প্রকৃত শুল্ক-কর পাওনা ছিল প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। কিন্তু সহকারী কমিশনার সাকিবের সহযোগিতায় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সহজেই চালানটি সরিয়ে নেয়। শুধু এই একটি ঘটনাই নয়, একজন সাধারণ শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে মাত্র ৫ দিনে প্রায় ৪০টি বিল অব এন্ট্রি খালাস করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ঢাকা কাস্টম হাউস ছাড়াও তাঁর সাবেক কর্মস্থল রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেটেও এমন নানা অনিয়মের অভিযোগ শোনা গেছে।
**কুরিয়ার ইউনিটে অনিয়মের ছড়াছড়ি**
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঢাকা কাস্টম হাউসের কুরিয়ার ইউনিট মূলত এলসি ছাড়াই নমুনা পণ্য আমদানির জন্য নির্ধারিত, যেখানে একজন ব্যক্তি বছরে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলারের নমুনা আনতে পারেন। কিন্তু সাকিব আনাম খান দায়িত্ব নেওয়ার পর কুরিয়ার ইউনিটটি বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের অন্যতম হাবে পরিণত হয়। নিয়মবহির্ভূতভাবে পণ্য খালাসের অবাধ সুযোগ থাকায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য এখন কুরিয়ার মাধ্যমেই বের হয়ে যাচ্ছে। কুরিয়ার ইউনিটের দায়িত্বে থাকাকালীন ‘ফুলএভার বিডি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাগজ আমদানির ঘোষণা দিয়ে ‘আরএফ লেভেল’ খালাস করে নিয়ে যায়। এই চালানে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করে চালানটি ছেড়ে দেন সাকিব আনাম খান। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তদন্ত শুরু হয় এবং ৭৬ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে মামলা করা হয়। তবে চালনটি আগেই ছেড়ে দেওয়ায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো রাজস্ব আদায় করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এছাড়া প্রিভেন্টিভ টিম কুরিয়ারের আরও ৩১টি চালানে লক দিলেও অনিয়ম রোধ করা যায়নি।
**ভুয়া এনআইডি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য**
শুধু ফুলএভার বিডি নয়, ‘ডেল্টা কার্গো মিডিয়া’র নামে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে মাত্র পাঁচ দিনে প্রায় ৪০টি পণ্য চালান খালাসের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু বিল অব এন্ট্রি নম্বর হলো—১০৯৯৬৯৫, ১০৯৯৭৫৬, ১০৯৯৭৪৫, ১০৮৮৭৩০, ১০৮৮৭০২, ১০৮৮৭১২, ১০৮৪৬৪২, ১০৮৪৫৪৮, ১০৮৩৩৪৫ ইত্যাদি। এসব অভিযোগের জেরে গত বৃহস্পতিবার তাঁকে ঢাকা কাস্টম হাউসের অন্য একটি শাখায় বদলি করা হয়। জানা গেছে, কুরিয়ারে তাঁর পদায়নের পর থেকেই দুটি সক্রিয় সিন্ডিকেট বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে এই কর্মকর্তার মাধ্যমে অবৈধভাবে পণ্য খালাস করে আসছিল। বন্ডের ফেব্রিক্স থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় পার করার বিষয়টি সেখানে ওপেন সিক্রেট ছিল। এর আগে রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে ঈশ্বরদী ইপিজেডে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হয়রানি করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় মাত্র দুই মাসের মাথায় তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন কমিশনার।
**কর্তৃপক্ষের বক্তব্য**
এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টমস হাউসের কমিশনার রইচ উদ্দিন খান জানান, কুরিয়ার ইউনিটে এক আমদানিকারক মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাস করেছে। তদন্তে সেখানে আরএফ লেভেল পাওয়া যাওয়ায় এবং প্রায় ৭৬ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই প্রতিষ্ঠানের পরবর্তী পণ্য চালানগুলো অবজারভেশনে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, ফুলএভার বিডিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটি কম মূল্য ঘোষণা করেছিল বলেই শুল্ক ফাঁকির মামলা হয়েছে। তবে এত টাকা রাজস্ব ফাঁকির পরও কীভাবে মাত্র ৩৫ হাজার টাকায় পণ্য ছেড়ে দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর না দিয়ে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
Leave a Reply