ফুসফুসের ক্যানসার কেবল ধূমপায়ী পুরুষদেরই হয়—এমন পুরনো ধারণা এখন অনেকটাই বদলাচ্ছে। সাম্প্রতিক নানা গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কখনো ধূমপান করেননি এমন নারীদের মধ্যেও এই রোগটি ক্রমশ বাড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে প্রধানত বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধূমপান এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যসহ নানা কারণ জড়িত রয়েছে।
‘দ্য ল্যানসেট রেসপিরেটরি মেডিসিন’ সাময়িকীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে সারা বিশ্বে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৮ হাজার জনই ছিলেন নারী। আক্রান্ত নারীদের বড় একটি অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রেই ক্যানসারের ধরন হিসেবে ‘অ্যাডেনোকার্সিনোমা’ সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে। এই গবেষণায় নারীদের ফুসফুসের ক্যানসারের সঙ্গে বায়ুদূষণের জোরালো সংযোগের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও চিত্রটি বেশ আশঙ্কাজনক। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশটিতে নারীদের ফুসফুসের ক্যানসারের প্রায় ৫২ দশমিক ৭ শতাংশই ছিল অ্যাডেনোকার্সিনোমা আক্রান্ত।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, বাতাসের অতিসূক্ষ্ম কণা বা পিএম ২.৫ সরাসরি ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম। বিশেষ করে যানবাহন ও কলকারখানার ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং ঘরের ভেতরে কাঠ কিংবা অন্যান্য জ্বালানি পোড়ানোর ধোঁয়া দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান, রেডন গ্যাস, অ্যাসবেস্টস ও আর্সেনিকের সংস্পর্শে আসা, পারিবারিক মেডিকেল ইতিহাস এবং জিনগত বিভিন্ন পরিবর্তনও এর অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে কাজ করে।
**যেসব লক্ষণ বা উপসর্গ এড়িয়ে চলা উচিত নয়**
প্রাথমিক পর্যায়ে কাশি, শ্বাসকষ্ট বা বুকে হওয়া সংক্রমণকে অনেকেই সাধারণ সর্দি-কাশি, মৌসুমি অ্যালার্জি বা হাঁপানি মনে করে ভুল করেন, যার ফলে রোগ নির্ণয় করতে দেরি হয়ে যায়। তাই কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:
* দীর্ঘদিন ধরে থাকা কাশি
* কোনো কারণ ছাড়াই ওজন হ্রাস পাওয়া
* কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া
* ক্রমান্বয়ে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া
* বারবার বুকে সংক্রমণ দেখা দেওয়া
এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ক্যানসারের ধরন ও অবস্থা বুঝে সাধারণত অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি এবং টার্গেটেড থেরাপি দেওয়া হয়ে থাকে। এছাড়া ইজিএফআর মিউটেশন ও এএলকে পরিবর্তন শনাক্ত করার জন্য মলিকিউলার পরীক্ষা রোগীকে সঠিক ও ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা দিতে সহায়তা করে।
তবে উপসর্গ না থাকলে এবং কখনো ধূমপান না করলেও সব নারীর নিয়মিত সিটি স্ক্যান করানোর প্রয়োজন নেই; বরং শারীরিক ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো—ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, রান্নায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার করা, সার্বিক বায়ুদূষণ থেকে দূরে থাকা এবং পরোক্ষ ধূমপান বর্জন করার মাধ্যমে এই ঝুকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ধূমপান না করার অর্থ এই নয় যে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা এবং সময়মতো রোগ নির্ণয়ই জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
Leave a Reply